গৌরব ও ঐতিহ্যে রাবির ৬৯ বছরে পদার্পণ

আব্দুস সবুর লোটাস:  বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে সোচ্চার থাকা এ বিদ্যাপীঠের জন্মদিন ও ৬৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। দীর্ঘ ৬৮ বছরের পথচলায় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গৌরব ও ঐতিহ্যে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ভাসিত। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই যাত্রা শুরু করেছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণআন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে রাবির শিক্ষক ও ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নিজের জীবনের বিনিময়ে ছাত্রদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন তৎকালীন প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। এছাড়াও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ুমসহ অনেক ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।

আজকের এ অবস্থানে আসতে দীর্ঘ কণ্টকময় পথ পাড়ি দিতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষা-দীক্ষা উন্নয়নের জন্য স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর রাজশাহীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।

১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ প্রাদেশিক আইনসভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন পাস হয়। ওই বছর অধ্যাপক ইতরাত হোসেন জুবেরীকে উপাচার্য নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইতরাৎ হোসেন জুবেরীকে সঙ্গে নিয়ে মাদার বখ্শ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।

শুরুতে ১৬১ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ৩০৩ দশমিক ৮০ হেক্টরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১১৭৭ জন শিক্ষক ও ২০০০ জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৩৩০ জন (বিদেশি শিক্ষার্থী ৫৮ জন)। ১২ অনুষদের অধীনে বিভাগ রয়েছে ৫৯টি। ১২টি একাডেমিক ভবনসহ বর্তমানে রাবির ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক হল রয়েছে মোট ১১টি ও ছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৬টি। এছাড়া গবেষক ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি।

সুদীর্ঘ সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে অনেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবদান রেখেছেন। দীর্ঘ এ সময়ে রাবি তৈরি করেছে ভাষা বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, ইতিহাসবিদ আব্দুল করিম, তাত্ত্বিক ও সমালোচক বদরুদ্দীন উমর, চলচ্চিত্র পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিম, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মাসুম রেজা ও জাতীয় ক্রিকেটার আল আমিন হোসেনদের মতো অসংখ্য গুণীজনকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, বিগত প্রায় সাত দশক ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর স্নাতকরা দেশ-বিদেশে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য ও উৎকর্ষের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। আগামী দিনগুলোতেও সে ধারা অক্ষুন্ন থাকবে বলে আমি আশা রাখি। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের এক গতিশীল ধারা চলছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুকুল পরিবেশ গড়ে উঠছে। এজন্য সরকারের প্রতি আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী জ্ঞানকেন্দ্র।

দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভিন্ন বিভাগের পক্ষ থেকে নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। তবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও লকডাউনের কারণে বড় পরিসরে কোনো কর্মসূচির আয়োজন করেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এবার সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হবে।

ইউকে/এএস