পারিবারিক গোপনীয়তা ফাঁস অমার্জনীয় পাপ

|| মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ || 

ফ্যামিলি সিক্রেটস বা পারিবারিক গোপনীয়তা বলে একটি কথা আছে। বিশেষভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বহু গোপন কথা থাকে। সেসব কথা হয়তো পরস্পরের, নয়তো একেবারে নিজস্ব। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবন পার হয়েও মনের গভীরের গোপন কথাটি হয়তো জানা হয় না। এই গোপন বিষয় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে টানাপড়েন, অশান্তি, বিবাদ-কলহ তৈরি হয়। কারো গোপন কথা প্রকাশ করা তার জন্য বিব্রতকর, বিপজ্জনকও বটে। এসব ঘটনা বর্তমানকে যেমন তিক্ত ও বিষময় করে তোলে, তেমনি ভবিষ্যতকে করে তোলে অনিরাপদ। পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়ে নীরব সংক্রমণ। সন্তানদেরও ভুগতে হয়। তারা যখন বড় হয়, ওই জটিল মনঃকাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না অনেকে।

স্বামী-স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস জঘন্যতম পাপ : ইসলামে মানুষকে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা গর্হিত অপরাধ। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম মানুষ হবে ওই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ৩৪৩৪)

অন্য বর্ণনায় হাদিসটি এভাবে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা বড় আমানত খিয়ানতকারী বিবেচিত হবে, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সঙ্গে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। (মুসলিম, হাদিস : ৩৪৩৫)

পারিবারের সদস্যদের গোপনীয়তা রক্ষা জরুরি : শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, পরিবারের যেকোনো সদস্যের এ ধরনের গোপন কথা প্রকাশ করা খুবই অন্যায়। নবী-পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে খুবই সজাগ ও সতর্ক ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার আমরা নবী (সা.)-এর সব স্ত্রী তাঁর কাছে জমায়েত হয়েছিলাম। আমাদের একজনও অনুপস্থিত ছিলাম না। এমন সময় ফাতেমা (রা.) হেঁটে আসছিলেন। আল্লাহর কসম! তাঁর হাঁটা রাসুল (সা.)-এর হাঁটার মতো ছিল। তিনি যখন তাঁকে দেখলেন, তখন তিনি ‘আমার মেয়ের আগমন শুভ হোক’ বলে তাঁকে সংবর্ধনা জানালেন। এরপর তিনি তাঁকে নিজের ডান পাশে অথবা বাম পাশে বসালেন।

মেয়ের সঙ্গে মহানবীর গোপন আলাপ : অতঃপর তিনি তাঁর সঙ্গে কানে কানে কিছু কথা বলেন। তিনি (ফাতেমা) খুব বেশি কাঁদতে লাগলেন। এরপর তাঁকে চিন্তিত দেখে দ্বিতীয়বার তাঁর সঙ্গে তিনি কানে কানে আরো কিছু কথা বললেন। তখন ফাতেমা (রা.) হাসতে লাগলেন। তখন নবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্য থেকে আমি বললাম, আমাদের উপস্থিতিতে রাসুল (সা.) বিশেষ করে আপনার সঙ্গে বিশেষ কী গোপনীয় কথা কানে কানে বললেন, যার ফলে আপনি খুব কাঁদছিলেন? এরপর যখন নবী (সা.) উঠে চলে গেলেন, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি আপনাকে কানে কানে কী বলেছিলেন? ফাতেমা (রা.) বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর ভেদ (গোপনীয় কথা) ফাঁস করব না।

মৃত্যুর পর মহানবীর গোপন সুসংবাদ প্রকাশ : এরপর রাসুল (সা.)-এর ওফাত হলো। তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনার ওপর আমার যে দাবি আছে, আপনাকে আমি তার কসম দিয়ে বলছি যে আপনি কি গোপনীয় কথাটি আমাকে জানাবেন না? তখন ফাতেমা (রা.) বললেন, হ্যাঁ, এখন আপনাকে জানাব। সুতরাং তিনি আমাকে জানাতে গিয়ে বলেন, প্রথমবার তিনি আমার কাছে যে গোপন কথা বলেন, তা হলো এই যে তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেন যে জিবরিল (আ.) প্রতিবছর এসে পূর্ণ কুরআন একবার আমার কাছে পেশ করতেন। কিন্তু এ বছর তিনি এসে তা আমার কাছে দুইবার পেশ করেছেন। এতে আমি ধারণা করছি যে আমার চির বিদায়ের সময় সন্নিকট। সুতরাং তুমি আল্লাহকে ভয় করে চলবে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে। নিশ্চয়ই আমি তোমার জন্য উত্তম অগ্রগমনকারী। তখন আমি কাঁদলাম যা আপনি নিজেই দেখলেন। তারপর যখন আমাকে চিন্তিত দেখলেন, তখন দ্বিতীয়বার আমাকে কানে কানে বলেন, তুমি জান্নাতের মুসলিম নারীদের অথবা এ উম্মতের নারীদের নেত্রী হওয়াতে সন্তুষ্ট হবে না? (আমি তখন হাসলাম)। (বুখারি, হাদিস : ৬২৮৫)

এভাবেই স্বামী-স্ত্রী ও পরিবারের গোপন কথা সংরক্ষিত রাখা ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য।

ইউকে/এসএম