নতুন প্রজাতির উভচর ‘লালচোখ ব্যাঙ’

বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন: ‘ব্যাঙ’ শব্দটির সঙ্গে তাচ্ছিল্য বা অবহেলাজুড়ে আছে। কাউকে তিরস্কার করতে বা বিষয়টিকে ক্ষুদ্রতর করতে এ শব্দটি কথার শেষাংশে জুড়ে দেওয়া হয়। যা বহুকাল ধরে প্রচলিত হয়ে আসছে। শুধু উপমাগত বিশ্লেষণ দ্বারা একটি উপকারী প্রাণীকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, আমাদের প্রকৃতি এবং প্রতিবেশ ব্যবস্থায় অনেক উপকারী একটি ‘উভচর প্রাণী’ ব্যাঙ। এরা প্রকৃতির সুরক্ষক হিসেবে খাদ্যশৃংখলের ভারসাম্যরেখায় নীরবে বিরাট ভূমিকা পালন করে।

তবে আশা কথা হলো, বাংলাদেশ থেকে আরও একটি নতুন প্রজাতির ব্যাঙ পেল বিশ্ব। ব্যাঙটি আবিষ্কার করা হয়েছে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকে। গবেষকরা এই ব্যাঙের ইংরেজি নাম দিয়েছেন Sylheti Litter Frog আর বাংলা নামকরণ করেছেন ‘সিলেটের লালচোখ ব্যাঙ’।

এ আবিষ্কারের গল্প হিসেবে বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল রাজী বলেন, ‘আগে আমাদের এই ব্যাঙটিকে Leptobrachium smithi মনে করা হতো। কিন্তু Leptobrachium smithi বিস্তৃতি বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে। এবং এই বিস্তৃত মধ্যেই আরোও দুটি এই গণের ব্যাঙ পাওয়া যায় Leptobrachium rakhinense অন্যটি Leptobrachium tenasserimense। এসব কিছু চিন্তা করে আমাদের মনে হয় যে আমাদের দেশে Leptobrachium গণের যে প্রজাতিটি আছে সেটা আসলেই Leptobrachium Smithi হতে পারে না। এরই মধ্যে আমাদের সঙ্গে রাশিয়ান প্রফেসর Nick Poyarkov এর যোগাযোগ হয়। তিনি আমাদের এই ব্যাঙ নিয়ে একই কথা ভাবছিলেন। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ৩ জন মিলে একটা গবেষণা পরিকল্পনা করে গত বছরের জুনের ফিল্ডের কাজ শুরু করি। আমাদের কাছে এ কাজের জন্য বন বিভাগের যে অনুমতি ছিল তা শেষ হতে আর মাত্র একমাস ছিল। আমাদের পুরো কাজটি রাশিয়া থেকেই সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও সার্বিক সহযোগিতা করেছেন রাশিয়ান প্রফেসর Nick Poyarkov. এই Leptobrachium sylheticum, নতুন প্রজাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমরা এই ব্যাঙের শারীরিক পরিমাপ, এদের মলিকুলার বিশ্লেষণের পাশাপাশি এদের ডাকের বিশ্লেষণও করেছি, যা এই গণের অন্য ব্যাঙদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আমাদের গবেষণা থেকে আমরা জানতে পারি যে আমাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই Leptobrachium গণের ব্যাঙগুলো Leptobrachium sylheticum এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ব্যাঙগুলো Leptobrachium Sylheticum অথবা Leptobrachium rakhinense.

এই ব্যাঙের নামকরণ ও জীবনপ্রবাহ সস্পর্কে হাসান আল রাজী বলেন, ‘এই ব্যাঙগুলো মূলত বনের ভেতরে পাওয়া যায়। বনের ঝরা পাতার মধ্যে ওরা থাকে। ঝরা পাতার মধ্যে এরা এমন ভাবে মিশে থাকে যে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কোনো ব্যাঙ আছে। তবে প্রজননের সময় এরা এই ঝরা পাতা ছেড়ে ছড়ায় নেমে আসে। ছড়ার প্রবাহমান স্বচ্ছ পানিতে এরা ডিম দেয়। ডিম ফুটে ব্যাঙ্গাচিগুলোছড়ার পানিতে বড় হয়। ঝরা পাতায় থাকে বলে এই ব্যাঙকে ইংরেজীতে Litter Frog বলে। তাই আমরা আমাদের এই ব্যাঙের ইংরেজি নাম দিয়েছি Sylheti Litter Frog আর বাংলানাম ‘সিলেটের লালচোখ ব্যাঙ’।

৩ গবেষক দলের অপর সহযোগী গবেষক মার্জান মারিয়া বলেন, আসলে এই আবিষ্কারের অনুভূতি ভাষার ব্যক্ত করা অনেক কঠিন। বাংলাদেশ থেকে নতুন কিছু আবিষ্কার করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। এটা ভেবেই ভালো লাগছে যে, এই ব্যাঙ এর কথা যতোবার স্মরণ করা হবে আমাদের দেশের নামও ততোবারই নেয়া হবে। ভবিষ্যতে এমন আরো কাজ করতে চাই এবং করার সুযোগ চাই।

এই ব্যাঙ আবিষ্কার করতে পেরে অনেক আনন্দিত কিন্তু একইসঙ্গে দুঃখিত। কারণ জীববৈচিত্রে ভরপুর লাউয়াছড়া বন তার রূপ হারাচ্ছে। এই ব্যাঙসহ এই পর্যন্ত লাউয়াছড়া বন থেকে বিশ্বের জন্য দুটি নতুন ব্যাঙ আবিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও পাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। বনের যেই ছড়াগুলোতে এই ব্যাঙসহ অন্য ব্যাঙ প্রজনন করে সেই ছড়াগুলোর বেশিরভাগ শুকিয়ে গেছে। এমনটা হতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সিলেটের লালচোখ ব্যাঙ আর লাউয়াছড়া বনে পাওয়া যাবে না। এই ব্যাঙগুলো সংরক্ষণের জন্য এই ছড়াগুলোকে আমাদের বাঁচাতে হবে বলেও জানান বন্যপ্রাণী গবেষক হাসান আল রাজী।

ইউকে/এসএম