প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে গ্রামীণ নেতৃত্বের অবদানে রাজশাহীর পবায় ২২ নারীকে সম্মাননা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উপলক্ষে রাজশাহীর পবা উপজেলার বিলনেপালপাড়া এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারে আজ বুধবার (১৪ অক্টোবর) খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের ২২ জন গ্রামীণ নারীকে তাঁদের অবদান ও উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘গ্রামীণ নারী সম্মাননা ২০২৬’ প্রদান করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্যবৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দেশি বীজের বিস্তার, এগ্রোইকোলজি চর্চা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রাকৃতিক খাদ্য সংরক্ষণ এবং নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে অবদান রাখার জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার এই নারীদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

বারসিক ও গ্রিন কোয়ালিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন গ্রিন কোয়ালিশনের পবা উপজেলার সভাপতি মোসা: রহিমা বেগম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নদী ও পরিবেশ গবেষক, গ্রিন কোয়ালিশনের রাজশাহী জেলার সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী, উপ-সহাকারী কৃষি কমর্ক র্তা আব্দুর রাজ্জাক। এছাড়া কৃষক, নারী সংগঠক, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ, দেশি বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়, প্রাণিসম্পদ পালন, জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ, পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষ এবং পরিবেশবান্ধব চুলার ব্যবহার সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের অনেকেই প্রতিবেশী ও আশপাশের গ্রাামের নারীদের সঙ্গে বীজ বিনিময় করছেন, জৈব বালাইনাশক তৈরির পদ্ধতি শেখাচ্ছেন এবং নারীদের সংগঠিত করছেন। পবা, তানোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এলাকার এসব নারীর উদ্যোগে স্থানীয় কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও কৃষকের মধ্যে জ্ঞান বিনিময়ের নানা দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। তাঁদের কেউ ৪০ থেকে ৪৯ প্রজাতির বীজ সংরক্ষণ করছেন, কেউ বহু জাতের দেশি কলা ও ফল চাষ করছেন, আবার কেউ স্বল্প জমিতে বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদন করে পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছেন। কয়েকজন নারী বহু গ্রামের নারী ও কৃষকের কাছে বীজ সংরক্ষণ, বিনিময় এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের অভিজ্ঞতা পৌঁছে দিয়েছেন।

সম্মাননাপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন- শিল্পী বেগম, আয়েশা বেগম, মিনারা বেগম, পান্না বেগম, মাহমুদা বেগম, মর্জিনা বেগম, সেতারা বেগম, পানি মার্ডি, সুমি বেগম, পরি টুডু, চিচিলিয়া হাসদা, অঞ্জলী রানী, তিথি সরেণ, মাইনো বাসকি, সাগরী রানী, সেলিনা বেগম, তহমিনা বেগম, শাহানা বেগম, বিলকিস বেগম, রুবিনা খাতুন, জেসমিন বেগম এবং মার্জিনা টুডু।

উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে শিল্পী বেগমের বসতবাড়িতে পাঁচ জাতের ২৩০টি প্রাণিসম্পদ পালন ও ২৫ ধরনের বীজ বিনিময়; আয়েশা বেগমের বরেন্দ্র অঞ্চল উপযোগী ১৪ জাতের দেশি কলা সংরক্ষণ ও বিনিময়; মিনারা বেগমের ছয়টি গ্রামের ১২০ জন নারীকে পরিবেশবান্ধব চুলা তৈরি করে দেওয়া এবং এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ; সেতারা বেগমের পাঁচটি গ্রামের ১৪৫ জন নারীর মধ্যে ২১ জাতের সবজি বীজ বিনিময়; এবং মাজির্না টুডুর ৪৭ জাতের বীজ সংগ্রহ ও ১০টি গ্রামের ১৭৫ জন নারীর মধ্যে বীজ বিনিময়। অন্যদিকে, বিলকিস বেগম ভামির্ক ম্পোস্ট উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্ব াবলম্বিতা অজর্ন করেছেন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তানোর উপজেলার মাহালী পাড়ার আদিবাসী নারী কৃষাণী চিচিলিয়া হেমব্রম বলেন- ‘পানি খরার সাথে লাড়াই করে আমাদের বাঁচতে হয়, অনেক দুরে পানি আনতে হয়, জমিতে পানি নাই, খরাসহনশীল রবি শস্যের চাষ করি, যাতে পানি লাগে। আমি পাড়ার অন্যদের বীজ দিয়ে সহায়তা করি।’

রাজশাহীর পবা উপজেলার দুয়ারি পাড়ার কৃষাণী মোস: জেসমিন বেগম বলেন-‘ভার্মীকম্পোস্ট তৈরী করে আমি সরকারিভাবেও স্বীকৃতি পাচ্ছি, বারসিকের সহায়তায় একজনের কাজে আমি ভার্মী কম্পোস্ট শিখি, এখন আমি নিজেই স্বালম্বী। আমাকে ইতালি থেকে এই কাজের
অভিজ্ঞতা বিনিময়ে জন্য ডেকেছে।’

নাচোল উপজেলার আঝৈর গ্রামের মোসা: শাহানা বেগম বলেন- ‘কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি কম, আমারা অনেক কিছুতেই অবদান রাখি, কিন্তু সরকারিভাবে আমাদের স্বীকৃতি কম, আমি নিজেই ৭ গ্রামের ১১০জন নারীকে জৈব বালাই পদ্ধতি শিখিয়েছি।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে গ্রামীণ নারী সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তুলে ধরেন বারসিক’র নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন- সম্মাননা প্রাপ্ত গ্রামীণ নারীদের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাঁরা কৃষি ও পরিবেশ সংরক্ষণকে শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বীজ বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা, স্থানীয় জ্ঞানের চর্চা এবং সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তাঁরা গ্রামীণ সমাজে জ্ঞান ও সম্পদ ভাগাভাগির র্চাকে শক্তিশালী করছেন। তাঁদের উদ্যোগ দেখায়, গ্রামীণ
নারীরা পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিজীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

তিনি আরো বলেন- আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই সম্মাননার লক্ষ্য হলো গ্রামীণ নারীদের অবদানকে দৃশ্যমান করা, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ও টেকসই গ্রামীণ জীবিকার প্রসারে তাঁদের নেতৃত্বকে উৎসাহিত করা।

সম্মানা অনুষ্ঠানে গ্রিন কোয়ালিমনের সভাপতি মাহবু সিদ্দিকী বলেন- ‘গ্রামীণ নারীরাই আমাদের কৃষি সুরক্ষা কওে চলেছেন, ঐতিহ্যবাহী কৃষির সুরক্ষাদাতা তারাই।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ও গ্রিন কোয়ালিশনের সভাপতি- রহিমা বেগম বলেন- ‘নারীদের হাত ধরেই সভ্যতা, নারী পুরুষের যৌথ উদ্যোগেই এগিয়ে যাচ্ছে সভ্যতা, কৃষি সংস্কৃতি সুরক্ষায়, বিষমুক্ত কৃষি, নিরাপদ কৃষি আরো বেশি বেশি চর্চা হোক।’

দর্শন পাড়া ইউনিয়নের নির্বাচিত নারী সদস্য শুকিলা বেগম বলেন-‘একজন নারী হয়েও আমি ইউনিয়ন পরিষিদে নেতৃত্ব দিচ্ছি, নারীদের আরো এগিয়ে আসতে হবে, নিজেদের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে শুধু নারী নয়, পুরুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

ইউকে/আরএ/এসএস